Home Viral Login

এআই (AI) যেভাবে মৃত মানুষের সাথে কথা বলাচ্ছে: বিজ্ঞান নাকি প্রতারণা?

এআই প্রযুক্তি বা ডেথবট (Deathbots) দিয়ে কি মৃত মানুষের সাথে কথা বলা যায়? জানুন এর পেছনের আসল বিজ্ঞান এবং এটি মানুষের আবেগকে নিয়ে এআই এর ব্যবসা নাকি আধুনিক প্রতারণা।

আমরা কি কখনো ভেবেছি যে মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও তার সাথে নতুন করে কথা বলা সম্ভব? কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার সেই অদ্ভুত দৃশ্যগুলো এখন আমাদের বাস্তব জীবনের কড়া নাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির কল্যাণে এখন দাবি করা হচ্ছে—মৃত মানুষের সাথেও নাকি কথা বলা সম্ভব!

কিন্তু প্রযুক্তির এই ম্যাজিক কি আসলেই কোনো বৈজ্ঞানিক সাফল্য, নাকি মানুষের আবেগকে পুঁজি করে এক ধরনের আধুনিক প্রতারণা? চলুন একদম সহজ ভাষায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা যাক।

মৃত মানুষের সাথে এআই-এর কথা বলা: আসলে বিষয়টি কী?

প্রযুক্তি বিশ্বে এই ব্যাপারটিকে বলা হচ্ছে 'ডেথবট' (Deathbots) বা 'গ্রিফটেক' (Grief Tech)। সহজ কথায়, এটি এমন এক ধরনের এআই প্রযুক্তি, যা কোনো মৃত মানুষের অবিকল ডিজিটাল রূপ বা 'অবতার' তৈরি করতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বে Project December, HereAfter AI কিংবা Re;memory-এর মতো বেশ কিছু প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যারা এই সুবিধা দিচ্ছে। আপনি চাইলে আপনার প্রিয় কোনো মানুষ, যিনি আর বেঁচে নেই, তার সাথে চ্যাট করতে পারবেন, এমনকি তার চেনা কণ্ঠস্বরে কথাও বলতে পারবেন!

পেছনের আসল বিজ্ঞান: ভূতুরে জাদু নাকি ডেটার খেলা?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এআই দিয়ে কি মৃত মানুষের সাথে আসলেই কথা বলা যায়? উত্তর হচ্ছে—না, কোনো মৃত মানুষের আত্মা বা চেতনার সাথে এআই যোগাযোগ করিয়ে দেয় না। এর পেছনে রয়েছে নিখাদ ডেটা সায়েন্সের খেলা। এটি মূলত তিনটি ধাপে কাজ করে

• ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সংগ্রহ: একজন মানুষ alive থাকতে বা বেঁচে থাকতে ইন্টারনেটে যা কিছু রেখে যান—যেমন তার ফেসবুক পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ইমেইল, ডায়েরি এবং অডিও-ভিডিও রেকর্ড—সেগুলো এআই সিস্টেমে ইনপুট দেওয়া হয়।

• লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM): চ্যাটজিপিটি বা গুগলের মতো উন্নত এআই এই ডেটাগুলো স্ক্র্যাপ করে বিশ্লেষণ করে। এআই শিখে নেয় ওই মানুষটি কেমন শব্দ ব্যবহার করতেন, তার কথা বলার স্টাইল কেমন ছিল কিংবা তিনি কোন বিষয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতেন।

• ভয়েস ক্লোনিং ও ডিপফেক: মৃত মানুষের পুরনো অডিও ক্লিপ থেকে তার গলার আওয়াজ হুবহু নকল (Voice Cloning) করা হয়। ফলে স্ক্রিনের ওপাশ থেকে যখন এআই কথা বলে, তখন মনে হয় প্রিয় মানুষটিই কথা বলছেন।

বিজ্ঞান নাকি প্রতারণা: কেন উঠছে এই প্রশ্ন?

প্রযুক্তির দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় আবিষ্কার। কিন্তু একে অনেকেই 'আধুনিক ডিজিটাল প্রতারণা' বা 'মানুষের আবেগকে নিয়ে এআই এর ব্যবসা' বলে আখ্যা দিচ্ছেন। এর কারণগুলো বেশ জোরালো:

ব্যবসার আড়ালে আবেগের শোষণ

এই সেবা দেওয়া কোম্পানিগুলো কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। তারা মূলত মানুষের চরম শোকের মুহূর্তকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে। মৃত মানুষের সাথে কথা বলার জন্য প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের সাবস্ক্রিপশন ফি বা টাকা দিতে হয়। মানুষের দুর্বল আবেগকে এভাবে পণ্যে রূপান্তর করাকে অনেকেই প্রতারণা মনে করেন।

এটি কৃত্রিম মায়াজাল বা হ্যালুসিনেশন

এআই কখনোই মানুষের অনুভূতি বোঝে না। এটি কেবল অতীতের ডেটা সাজিয়ে উত্তর তৈরি করে। অনেক সময় এআই এমন কিছু অদ্ভুত বা ভুল তথ্য (AI Hallucination) দিয়ে বসে, যা ওই মৃত মানুষটি বেঁচে থাকলে কখনোই বলতেন না। এই নকল ব্যক্তিত্ব দিয়ে স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়া এক ধরনের মানসিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

স্বাভাবিক শোক কাটিয়ে ওঠার পথে বাধা

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের মৃত্যুর পর শোক কাটিয়ে ওঠা (Grief Processing) জীবনের একটি স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এই ডেথবটগুলো মানুষকে অতীত থেকে বের হতে দেয় না। মানুষ এক অবাস্তব মায়ার মধ্যে আটকে থাকে, যা তাকে পরবর্তীতে আরও বেশি একাকী ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।

ফিচারের নাম বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা কেন এটি মানসিক প্রতারণা?
কথোপকথন পুরনো টেক্সট ও চ্যাটের গাণিতিক অনুকরণ মাত্র। এতে কোনো নতুন অনুভূতি বা আসল মানুষের চেতনা নেই।
কণ্ঠস্বর ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি নকল আওয়াজ। প্রিয় মানুষের কণ্ঠ নকল করে এক অবাস্তব ভ্রম তৈরি করা।
মূল উদ্দেশ্য মানুষের ডিজিটাল মেমোরি বা স্মৃতি সংরক্ষণ। ব্যবহারকারীকে পেইড সাবক্রিপশনে আটকে মুনাফা করা।

শেষ কথা: আমাদের কি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত?

বিজ্ঞান আমাদের অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছে, তবে সব সম্ভাবনাই মানুষের জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। মৃত মানুষের রেখে যাওয়া ছবি, ভিডিও বা ডায়েরি দেখে তাকে মনে রাখাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এআই-এর তৈরি একটি 'নকল রোবট'কে প্রিয় মানুষ ভেবে তার সাথে দিনের পর দিন কথা বলা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়।

দিনশেষে, প্রযুক্তি আমাদের স্মৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তাই এআই-এর এই চমৎকার প্রযুক্তিকে সায়েন্সের একটি দারুণ আবিষ্কার বলা গেলেও, বাস্তব জীবনে এর ব্যবহার মানুষের আবেগের সাথে এক নির্মম প্রতারণাই বটে!